‘নামসর্বস্ব’ প্রতিষ্ঠান তিন শতাধিক, পড়ালেখা নেই, শিক্ষার্থীও কম
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার দাসনাইপাড়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসা থেকে মাত্র ১ জন শিক্ষার্থী চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। ১২ জন শিক্ষক মিলে ঐ শিক্ষার্থীকে পড়ানোর পরও সে অকৃতকার্য হয়েছে। খুলনার আসমা সারোয়ার ইসলামিক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন। অথচ এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র দুজন। দুই পরীক্ষার্থীর কেউই পাশ করতে পারেনি। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের বলরামহাট মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এ বছর মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। আর বোদা সর্দারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নেওয়া তিন পরীক্ষার্থীর কেউই পাশ করতে পারেনি। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী কারিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জন শিক্ষক মাত্র তিন জন পরীক্ষার্থীকে পাঠদান করিয়ে এক জনকেও পাশ করাতে পারেননি। নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার পাটুলী ইউনিয়নের সুটুরিয়া ফজলুল হক খান দাখিল মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষক থাকলেও এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৬ জন শিক্ষার্থীর কেউই পাশ করতে পারেনি। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র ৫ জন। বিদ্যালয়ে শিক্ষক ৮ জন। তবুও পাশ করেনি এক জনও।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু এই সাতটি নয়, সারা দেশে এমন ‘নামসর্বস্ব’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তিন শতাধিক, যেগুলোতে পড়ালেখা হয় না বললেই চলে। শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কম। শিক্ষকসংকট এবং নিয়মিত ক্লাস না হওয়ার ঘটনাও ভয়াবহ। শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে এসে ঘুরেফিরে চলে যান। শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও কম। অথচ তাদের বেশির ভাগই এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বেহাল চিত্র সামনে চলে এসেছে। এবার দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাশ করেনি। শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের থেকে এবার ১৭৮টি বেড়েছে। গত বছর শূন্য পাশ প্রতিষ্ঠান ছিল ১৩৪টি। অবশ্য এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও ছিল কম। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ জনের কম শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শতাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র ৫ থেকে ৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। আবার কয়েকটিতে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিভাগীয় বা জেলা শহরের তুলনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা, গ্রাম, উত্তরাঞ্চল, চর ও দুর্গম এলাকায় এসএসসিতে শূন্য পাশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি। বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা এ তালিকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই অবস্থান দেশের উত্তরাঞ্চল, হাওর-চরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকায়। শূন্য পাশের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠান ২২৬টি। এর বাইরে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৫৭টি আর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ২৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অর্থাত্ মোট শূন্য পাশ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ শতাংশ মাদ্রাসা। শূন্য পাশের তালিকা দীর্ঘ হওয়ায় শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র জানায়, ৩১২ প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাশ করতে পারেনি, তা খোঁজার চেষ্টা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে দাখিল পরীক্ষায় যে ২২৬টি মাদ্রাসা থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাশ করেনি সেসব মাদ্রাসার প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। এছাড়া সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডগুলোও তাদের ডেকে কারণ জানার চেষ্টা করবে। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান সদুত্তর দিতে না পারে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা বাতিল হতে পারে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে একাধিক বার শূন্য পাশ আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, শূন্য পাশ করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমপিওর সব সুবিধা নেবে অথচ এক জন শিক্ষার্থীও পাশ করবে না, তা হতে দেওয়া যায় না।