রাজধানীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। ফাইল ছবি
রাজধানীতে একের পর দখল হয়ে যাচ্ছে খাল ও জলাশয়। উঁচু উঁচু ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনা কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই তোলা হচ্ছে। এতে খালের অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীতে সড়কে জমে যাচ্ছে পানি। সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন খাল দখলকারীদের উচ্ছেদ করলেও আবার সেটি কিছুদিন পরে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন না হওয়ায় অন্যরা খাল দখল করে ভবন তোলার সাহস করছেন। খালগুলো বাঁচাতে হলে সংস্থাগুলোকে আরো কঠোর হতে হবে।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনসহ তিনটি স্থাপনা উচ্ছেদ করে। নির্মাণাধীন ভবনটির ৭০ ভাগই খালের জায়গার ওপর বানানো হয়েছিল। এ সময় তাদের উচ্ছেদ করলেও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর আগে এই খালের জায়গা দখল করেই প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী ট্রাকস্ট্যান্ড গড়ে তোলে, সেটিও উচ্ছেদ করা হয়। তখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি এই খালের আরেকটি অংশ দখলমুক্ত করে ডিএনসিসি। আলোচিত খামার সাদেক এগ্রো বিশাল জায়গা দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলে। সেই খামারসহ প্রায় ৬০টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় উত্তর সিটি করপোরেশন। তবে তাদের কারো বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।মহানগরী, বিভাগীয় শহর, জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনের (২০০০) ৫ ধারা অনুযায়ী, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এ ছাড়া এ ধরনের জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর করা যাবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।
জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, কেউ আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি আইন অমান্যকারীর নিজ খরচে সেটা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
তবে অনেকে এসব জলধার বা খাল দখল করলেও অনেক প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে মামলা নিতে চায় না বলে অভিযোগ করেছেন রাজউকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা জানান, জলাধার ভরাট করার দায়ে আমরা যখন মামলা করতে যাই, তখন বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বিশেষ করে যারা এ ধরনের দখলদারিত্বের সঙ্গে জড়িত, তারা বেশির ভাগই সমাজের প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট।
একই কথা বলছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, যারা এসব খাল, নদী ও জলাশয় দখল করে স্থাপনা তুলছে, তারা বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজের প্রভাবশালী সদস্য। উলটো উচ্ছেদ করতে গেলে বিভিন্ন জায়গা থেকে বাধা আসে। তবে আমরা এসব বিষয়ে কঠোর। আদি বুড়িগঙ্গা চ্যানেল উদ্ধারে আমরা এমন অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি। তবে আমরা আমাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে গেছি সব ধরনের বাধা মোকাবিলা করে। সামনে আমরা এসব প্রভাবশালীর চাপের মুখেও কঠোরতার সঙ্গে আগামী মাস থেকে জিরানী, মান্ডা, শ্যামপুর ও কালুনগরে চারটি খাল দখলমুক্ত করার কাজ শুরু করব। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দখলবাজদের জেল-জরিমানা না হওয়ায় উদ্ধার করার পরেও খালগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। ইমারত বিধিমালা আইন, পরিবেশ আইনসহ বিভিন্নভাবে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। এটি করতে পারলে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। তাহলে কেউ আর জলাশয় বা খাল দখল করে স্থাপনা তোলার সাহস করবে না।